দাম্পত্য সুখের ভিত্তি হ’ল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি ভালবাসা-বোঝাপড়া। উভয়ের মনোবৃত্তি অনুরূপ হলে দাম্পত্য জীবনে সুখের অভাব ঘটার কথা নয়.
কিন্তু বাস্তবে সকলের জীবনে এই প্রার্থনা পূর্ণ হয় না। বিবাহের, এমন কি প্রেমজ বিবাহের অনতিকাল পরেই ব্যক্তিত্বের সংঘাত বাধে। পতি ও পত্নীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয় ও তা অনেক সময় উভয়ের মধ্যে দুস্তর ব্যবধানে পরিণত হয়, সুখের পরিবর্তে আসে অশান্তি, কোন কোন সময় বিচ্ছেদ।
এখন প্রশ্ন এই যে, জ্যোতিষ কি এই বিষয়ে আমাদের পূর্বেই সাবধান করতে পারে?
কোন জাতক বা জাতিকার কোষ্ঠী বিচারে আগেই যদি জানতে পারা যায় যে তাহার দাম্পত্য সুখের যোগ নেই, তা হলে তার বিবাহের আগে সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে.. বিবাহিত জীবন বিষয়ে সপ্তমভাবের মত দ্বিতীয়ভাবও বিচার করতে হবে ।
তা ছাড়া, দ্বিতীয়ভাব কুটুম্বস্থান। বিবাহিত জীবনে সাফল্য বা অসাফল্যের পিছনে কুটুম্বদের ভূমিকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ, পতি পত্নীর উভয় পক্ষেরই। সেই কারণেই বিবাহিত জীবনের জ্যোতিষিক অনুসন্ধানে ধনভাব ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, চতুর্থভাব (সুখ) এবং দ্বাদশ (শয্যা সুখ) ভাবেরও গুরুত্ব আছে।
স্থির কাকরত্বে শুক্র পত্নীকারক গ্রহ। সপ্তমভাবপতি ও সপ্তমপতির নবাংশপতি হতে পতির বিচার করতে হয়।
বিবাহোত্তর জীবনে সুখলাভের সম্ভাবনা বিষয়ে প্রাচীন জ্যোতিষ গ্রন্থাদিতে যা পত্নীসুখ বিষয়ে লিখিত, তা পতিসুখ সম্বন্ধেও প্রযোজ্য।
লগ্নের সপ্তমস্থান শুভ গ্রহের ক্ষেত্র এবং শুভগ্রহ দ্বারা যুক্ত বা দৃষ্ট হলে পত্নীসুখ ও শ্বশুর কুলোদ্ভব সুখ হয় এবং স্ত্রী রূপবতী গুণবতী হয়। বিপরীতে- বিপরীত ফল হয় অর্থাৎ সপ্তমস্থান পাপক্ষেত্র হয়ে পাপগ্রহযুক্ত বা দৃষ্ট হলে ঐ প্রকার সুখ হয় না। শুভাশুভ মিশগ্রহে মিশ্র ফল চিন্তনীয়।
লগ্নাপেক্ষা সপ্তমে বহু পাপগ্রহের অবস্থানে বহু স্ত্রী সত্ত্বেও স্বল্প সুখ এবং বহু শুভগ্রহের অবস্থানে একটি স্ত্রী হলেও বিশেষ সুখ হয়। পতির কুন্ডলীতে লগ্নপতি ও সপ্তমপতি যে গ্রহের ক্ষেত্রে ও নবাংশে অবস্থিত, সেই গ্রহের ক্ষেত্রে বা নবাংশে স্ত্রীর জন্ম হলে সেই পত্নী স্বামীর সুখদায়িনী হয়ে থাকে। পতির জন্মকুন্ডলীতে চন্দ্র যে রাশিতে অবস্থিত, সেই রাশির সপ্তমরাশিদর্শী গ্রহের বা তদরাশি স্থিত গ্রহের ক্ষেত্রে যদি স্ত্রীর জন্ম হয়, তাহা হলে সেই স্ত্রী পতিপ্রিয়া হয়।
নারীর জন্মকুন্ডলীতে দ্বিতীয়, সপ্তম ও দ্বাদশপতি বৃহস্পতি দৃষ্ট এবং কেন্দ্র কোনস্থ হলে, অথবা সপ্তমপতির দ্বিতীয়ে, সপ্তমে বা একাদশ স্থানে শুভ গ্রহের অবস্থানে জাতক/ জাতিকা স্ত্রী/ পতি পুত্র সুখে সুখী হয়।
চন্দ্র ও লগ্ন হতে সপ্তমভাব যদি নবমপতি বা স্বীয় পতি বা শুভগ্রহ যুক্ত/দৃষ্ট হয়, তাহা হলে সপ্তমভাবের শুভ হয় এবং সেক্ষেত্রে বিবাহিত জীবন সুখের হয়।
সপ্তমভাব যদি সমরাশি হয়, সেই রাশ্যাধিপতি ও শুক্র যদি সমরাশিস্থিত হয় এবং পঞ্চম ও সপ্তমভাবের অধিপতিদ্বয় বলবান হয় ও অস্তমিত না হয়, তাহা হলে স্ত্রী পুত্র সুখ হয়।
কোন নারীর জন্মকুন্ডলীতে যদি
ক) লগ্ন বা লগ্নপতি ও চন্দ্র সমরাশিস্থিত এবং শুভগ্রহ যুক্ত, অথবা
খ) চন্দ্র, লগ্ন ও চতুর্থভাব যদি শুভ গ্রহ যুক্ত বা দৃষ্ট, বা
গ) লগ্নাপেক্ষা ত্রিকোণে (লগ্নে, পঞ্চমে, নবমে) শুভগ্রহেরা অবস্থিত, অথবা যদি সপ্তমভাব ও ঐ ভাব নবংশের অধিপতি শুভগ্রহ হয়, তাহা হলে সেই নারী গুণবতী ও সৌভাগ্যবতী হয়। পতিসুখ না পেলে সেই নারীকে সৌভাগ্যবতী বলা যাবে না, সুতরাং এই সকল যোগে পত্নী পতিসৌখ্যলাভ করে।
পত্নীর পতিপ্রিয়া হবার আরও কয়েকটা যোগ —-
ক) লগ্ন সমরাশিতে এবং মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্র অতীব বলবান,
খ) লগ্নের নবাংশপতি শুভ গ্রহ
গ) লগ্নে শুক্র ও চন্দ্র বা বুধ ও চন্দ্র বা বুধ ও শুক্র অথবা শুভগ্রহ থাকলে,
ঘ) সপ্তমে একাধিক শুভগ্রহ বা পূর্ণচন্দ্র থাকলে,
ঙ) গুরু, শুক্র, বুধ ও চন্দ্র সকলেই লগ্নকে পূর্ণদৃষ্টি দিলে,
চ) লগ্ন থেকে কেন্দ্র কোণে বৃহস্পতি, বিশেষতঃ স্বগৃহে বা তুঙ্গ রাশিতে,
ছ) অষ্টমভাব থেকে নবমে এবং লগ্ন হতে নবমে শুধুমাত্র শুভ গ্রহের অবস্থান,
জ) লগ্ন ও রাশি শুধুমাত্র শুভগ্রহ দ্বারা দৃষ্ট।
দাম্পত্য সুখ বিচারে পতি-পত্নীর মিত্রতা-বৈরিতা বিচার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহে পাত্র-পাত্রীর কোষ্ঠীর মিল দেখার জন্য প্রচলিত যে অষ্টকূট যোটক বিচার পদ্ধতি ঐ পদ্ধতির অষ্টকুটের অন্যতম কুট, বর ও কন্যার উভয়ের রাশির অধিপতির মিত্রতা, ভাবী স্বামী-স্ত্রীর মানসিক সৌখ্যের অন্যতম নির্ণায়ক হিসাবে গণ্য হতে পারে। তবে এ’ছাড়া উভয়ের চন্দ্রস্থিত নবাংশ পতিদ্বয়ের এবং উভয়ের চন্দ্রস্থিত রাশির অধিপতির দ্বয়ের যে যে নবাংশে অবস্থিত সেই নবাংশ পতিদ্বয়েরও মিত্র আছে কিনা দেখা প্রয়োজন, থাকলে ভাবী বর বধুর মানসিক সম্প্রীতি বুঝতে হবে, না থাকলে সম্প্রীতির অভাব বুঝতে হবে।
দাম্পত্য সম্প্রীতি বা পতি-পত্নীর পরস্পর মিত্রতা-শত্রুতা বিষয়ে নানা যোগের উল্লেখ করার সময় অনেক সময় দাম্পত্যসুখের অভাবের যোগের কথাও বলা হয়েছে, তবে
দাম্পত্য সুখের অভাব সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু যোগ —
১) শুক্র অবস্থিত রাশি হতে সপ্তমে পাপগ্রহের অবস্থান বা শুক্র পাপযুক্ত,
২) চন্দ্র সপ্তমস্থ, সপ্তমপতি ব্যয়স্থ এবং শুক্র দুর্বল,
৩) দ্বাদশপতি লগ্নে বা সপ্তমে,
৪) ব্যয়াধিপ শত্রু নবাংশে নীচ নবাংশে. অষ্টমভাব-নবাংশে বা ষষ্ঠাষ্টমে স্থিত,
৫) শুক্রের ত্রিকোণে অর্থাৎ পঞ্চমে বা নবমে শনির অবস্থান,
৬) সপ্তমে শনির অবস্থান,
৭) সপ্তমপতি পাপ নবাংশে, বা নীচ নবাংশে,
৮) ক্রুর ষষ্ঠাংশে,
৯) শুক্র নীচ নবাংশে,
১০) সপ্তমপতি রবির রাশিতে অর্থাৎ সিংহে এবং রবি পাপগ্রহের রাশিতে বা নবাংশে এবং পাপগ্রহ যুক্ত,/দৃষ্ট,
১১) চন্দ্রের রাশিতে সপ্তম পতি ও চন্দ্র পাপ নবাংশে,
১২) স্ত্রীজাতকের সপ্তমে বা অষ্টমে পাপগ্রহ, বিশেষতঃ সপ্তমে একাধিক দুর্বল পাপগ্রহের অবস্থান, অথবা সপ্তমে পাপগ্রহ দৃষ্ট রবি স্থিত হলে।
দাম্পত্য সুখ বা সুখের অভাব সম্বন্ধে নির্দিষ্ট কিছু যোগের উল্লেখ এই প্রবেন্ধে করা হল, তবে কোন দম্পতির জীবনে সুখ বিষয়ে সিদ্ধান্ত করার জন্য, শুধুমাত্র এই যোগগুলি বা এই ধরণের যোগের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যাবে না-উভয়ের কোষ্ঠীর সামুহিক মূল্যায়ন, যোগকারী গ্রহের এবং চন্দ্র ও শুক্রের বলাবল ও শুভাশুভত্ব বিবেচনা করতে হয় ।
এছাড়া পাত্র পাত্রির লগ্ন থেকে দ্বাদশ ভাবের এবং গ্রহের যথা অগ্নি,পৃথবী,বায়ু,জল পরস্পরের বন্ধুত্বেব পূর্ণ সম্পর্ক হতে হবে তা না হলে হাজার চেষ্টা করেও উভয়ের মনের মিলন ঘটা সম্ভব নয় এতে অশান্তি অবসম্ভাবি ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন