এটা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক যে, যে বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়ে বেদ হলো সমাজের মূল ভিত্তি, সেখানে আমরা ভুলেই গেছি বেদের মূল শিক্ষাগুলো এবং নিজেদেরকে নানা ভুল-ভ্রান্তিসমূহের ধারণায় জড়িয়ে ফেলেছি যেমন, জন্মগত caste system-সহ নানারকম বৈষম্য। এরকম বিপথগামী চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা আমাদের সমাজকে ভীষণ ক্ষতিসাধন করেছে এবং বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছে। দলিত নামক জাতিচ্যুত ব্যক্তিদের আমরা দূরে ঠেলে দিয়েছি এবং এর ফলে আমাদের উন্নতি ও প্রগতির বিকাশ স্থবির হচ্ছে। এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে হিন্দু সমাজের মূলে গিয়ে বেদকে জানা - যার ফলে আমরা আমাদের মধ্যে ভাঙা সম্পর্কগুলো পুনরায় স্থাপণ করতে পারব। এই লেখায় আমরা চেষ্টা করব বেদ অনুযায়ী আমাদের caste system সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন করার এবং শূদ্রের আসল অর্থ খোঁজার। ১। প্রথমত, কোনো প্রকার হিংসা বা বৈষম্যের স্থাণ নেই বেদে যেকোনো ব্যক্তি সম্পর্কে - সে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, বা শূদ্র কিনা। ২। Caste system প্রায় নতুন। বেদে কোনো শব্দ নেই যার অর্থ বর্ণ/জাতি হতে পারে। আসলে, caste, জাতি আর বর্ণ এগুলো এক একটি এক এক অর্থ বহন করে। Caste হলো একটি ইউরোপীয় নবধারা যার সাথে বৈদিক সংস্কৃতির কোনো সামঞ্জস্যতা নেই। জাতি 'জাতি'র অর্থ হচ্ছে এক শ্রেণীভুক্তকরণ যার উৎস হচ্ছে জন্মে। ন্যায় সূত্র বলেছে "সমানপ্রসাভাত্মিকা জাতিহ্" অথবা তারা যাদের একইপ্রকার জন্মসূত্র যা এদেরকে একটি জাতিতে সমষ্টিবদ্ধ করে। একটি প্রাথমিক আরো বড় শ্রেণীভুক্তকরণ ঋষিদের দ্বারা করা হয়েছে চারভাবে: উদ্ভিজ (অর্থাৎ গাছপালা), আন্ডাজ (অর্থাৎ ডিম থেকে যার উৎপত্তি যেমন পাখি এবং সরীসৃপ), পিন্ডজ (স্তন্যপায়ী), উষ্মজ (তাপমাত্রা বা পরিবেষ্টনকারী আবহাওয়ার জন্য যার জন্ম যেমন ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া ইত্যাদি)। তেমনিভাবে নানাপ্রকার পশুসমূহ যেমন হাতি, সিংহ, খরগোশ ইত্যাদি তৈরি করে এক ভিন্ন 'জাতি'। একইভাবে সমস্ত মানবকুল তৈরি করে একটি 'জাতি'। একটি নির্দিষ্ট জাতির থাকবে একই ধরনের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য যারা সেই জাতি থেকে আরেক জাতিতে পরিবর্তিত হতে পারবে না এবং ভিন্ন জাতির বাচ্চা প্রসব করতে পারবে না। অর্থাৎ, জাতি হচ্ছে ঈশ্বরের সৃষ্টি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রেরা কোনোভাবেই ভিন্ন জাতি নয় কারণ তাদের মধ্যে জন্ম সূত্রগত বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগত কোনো পার্থক্য নেই যা তাদেরকে ভিন্ন করবে। পরবর্তীতে 'জাতি' শব্দটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে যেকোনো প্রকার শ্রেণীভেদকরণের জন্য। তাই সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন ভিন্ন সমাজকেও ভিন্ন ভিন্ন 'জাতি' হিসেবে আখ্যা দেই। কিন্তু এ শুধু ব্যবহারের সুবিধার জন্য। আসলে আমরা মানবকুল এক জাতিরই অংশ। বর্ণ প্রকৃত যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বোঝাতে তা হলো 'বর্ণ' ('জাতি' নয়)। 'বর্ণ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই চারকে বোঝাতেই নয়, বরং দস্যু ও আর্যদেরকেও। 'বর্ণ' অর্থ হচ্ছে তাহাই যাহা গ্রহণ করা হয় পছন্দের দ্বারা। তাই, যেখানে 'জাতি' ঈশ্বর দ্বারা প্রদত্ত, 'বর্ণ' হচ্ছে আমাদের নিজস্ব পছন্দগত। যারা আর্য হতে পছন্দ করে তাদের বলা হয় 'আর্য বর্ণ'। তেমনি যারা দস্যু হতে পছন্দ করে, তারা হয় 'দস্যু বর্ণ'। একইভাবে হয় ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। এই কারণেই বৈদিক ধর্মকে বলা হয় 'বর্ণাশ্রম ধর্ম'। বর্ণ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এটির ভিত্তি হচ্ছে নিজ পছন্দকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া ও যোগ্যতা অনুসারে পরিচালিত ব্যবস্থাকে অনুমোদন দেয়া। ৩। যারা বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত, তারা পছন্দ করেন 'ব্রাহ্মণ বর্ণ'। যারা প্রতিরক্ষা, যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করেন, তারা হন 'ক্ষত্রিয় বর্ণ'। যারা অর্থনীতি ও পশুপালনাদি পছন্দ করেন তারা হন 'বৈশ্য বর্ণ' এবং যারা নিয়োজিত আছেন অন্যান্য সেবামূলক কাজ-কর্মে, তারা হন 'শূদ্র বর্ণ'। এসব শুধু বোঝায় নানা ধরনের পছন্দ যেসব মানুষজন তাদের কর্মের জন্য নির্বাচন করেন এবং এর সাথে 'জাতি' বা জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ৪। পুরুষ সুক্তের অন্যান্য মন্ত্রসমূহ উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ব্রাহ্মণ এসেছে ঈশ্বরের মুখ থেকে, ক্ষত্রিয় হাত থেকে, বৈশ্য উরু থেকে এবং শূদ্র পা থেকে। সেইভাবে এইসব বর্ণসমূহ জন্মগত। কিন্তু কোনোকিছুই এর চেয়ে বেশী ভ্রান্তিজনক হতে পারে না। আসুন দেখি কেন: (অ) বেদ ঈশ্বরকে বর্ণনা করে আকারহীন ও অপরিবর্তনশীল হিসেবে। এমন ঈশ্বর কিভাবে বিশাল আকৃতির মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে যদি তিনি আকারহীনই হন? (যজুর্বেদ ৪০.৮) (আ) যদি ইহা সত্যিই হয়, তাহলে তাহা বেদের কর্মতত্ত্বের বিরোধীতা করবে। কারণ কর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির জন্মগত পরিবার পরিবর্তিত হতে পারে তার কর্ম অনুসারে। সুতরাং একজন ব্যক্তি যে শূদ্র পরিবারে জন্ম নেয়, পরের জন্মে এক রাজার পরিবারে জন্ম নিতে পারে। কিন্তু যদি শূদ্রেরা ঈশ্বরের পা থেকে এসে থাকে, তাহলে সেই একই শূদ্র ঈশ্বরের হাত থেকে কিভাবে জন্ম নেয়? (ই) আত্মা হলো সময়হীন এবং কখনো জন্ম নেয় না। সুতরাং আত্মার কখনোই কোনো বর্ণ হতে পারে না। এ শুধুমাত্র যখন আত্মা জন্ম নেয় মনুষ্য হিসেবে তখনই এর সুযোগ থাকে বর্ণ বেছে নেবার। তাহলে বর্ণ দ্বারা কি বোঝানো হয় যা ঈশ্বরের একাংশ হতে আসে? যদি আত্মা ঈশ্বরের দেহ থেকে জন্ম না নিয়ে থাকে, তাহলে কি এই বোঝায় যে আত্মার দেহ তৈরি হয়েছে ঈশ্বরের দেহের অংশ থেকে? কিন্তু বেদ অনুযায়ী, এমনকি প্রকৃতিও চিরন্তন। এবং এই একই অনু-পরমানু পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে নানা মনুষ্যের মধ্যে। তাই কৌশলগতভাবে ঈশ্বরের দেহ থেকে জন্ম নেয়া কারো পক্ষে অসম্ভব, এমনকি আমরা যদি ধরেও নেই ঈশ্বরের দেহ আছে। (ঈ) উপরে উল্লেখ করা পুরুষ সুক্ত রয়েছে যজুর্বেদের ৩১তম অধ্যায়ে (এবং ঋগবেদ ও অথর্ববেদ বাদে যেগুলোতে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। যজুর্বেদে এ হচ্ছে ৩১.১১)। প্রকৃতভাবে এর অর্থ কি তা বোঝার জন্য, আসুন দেখি এর আগের মন্ত্রের দিকে লক্ষ্য করি ৩১.১০। এতে প্রশ্ন করা হয়েছে - কে মুখ? কে হাত? কে উরু আর কেই বা পা? এর পরের মন্ত্র এর উত্তর দিয়েছে - ব্রাহ্মণ হলো মুখ, ক্ষত্রিয় হলো হাত, বৈশ্য হলো উরু এবং শূদ্র হলো পা। লক্ষ্য করুন, মন্ত্রটি কিন্তু বলছে না ব্রাহ্মণ "জন্ম নেয়" মুখ থেকে...এটি বলছে ব্রাহ্মণ "হলো" মুখ। কারণ যদি মন্ত্রটির অর্থ হতো "জন্ম নেওয়া" তাহলে এটি উত্তর দিত না আগের মন্ত্রের প্রশ্নটির "কে মুখ?" যেমন, যদি আমি প্রশ্ন করি "দশরথ কে?" উত্তরটি যদি হয় "রাম জন্ম নেন দশরথের ঘরে" তাহলে তা হবে অর্থহীন। প্রকৃত অর্থ হচ্ছে: সমাজে ব্রাহ্মণ বা বুদ্ধিজীবিরা তৈরি করে মস্তিষ্ক বা মাথা বা মুখ যা চিন্তা করে এবং বলে। ক্ষত্রিয় বা রক্ষণকর্মীরা তৈরি করে হাত যা রক্ষা করে। বৈশ্য বা উৎপাদনকারীরা এবং ব্যবসায়ীরা তৈরি করে উরু যা ভার বহন করে এবং যত্ন করে (লক্ষ্য করুন উরুর হাড় অথবা উর্বাস্থি তৈরি করে রক্ত এবং এ হচ্ছে দেহের সবচেয়ে শক্ত হাড়)। অথর্ববেদে উরুর বদলে "মধ্য" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ বোঝায় পাকস্থলী এবং দেহের মধ্যের অংশ। শূদ্র বা শ্রমিকেরা তৈরি করে পা যা কাঠামোটিকে দাঁড় করায় এবং দেহকে চলতে সক্ষম করে। পরবর্তী মন্ত্রগুলো আলোচনা করেছে অন্যান্য দেহের অংশ সম্পর্কে যেমন - মন, চোখ ইত্যাদি। পুরুষ সুক্ত বর্ণনা করেছে সৃষ্টির সূত্রপাত এবং তার স্থায়ী থাকা সম্পর্কে যার মধ্যে অন্তর্গত মানব সমাজ এবং বর্ণনা করেছে অর্থপূর্ণ সমাজের উপাদানসমূহকে। তাই এ ভীষণ করুণ অবস্থা যে এমন সুন্দর সমাজ সম্পর্কে রূপক বর্ণনা এবং সৃষ্টি সম্পর্কিত বর্ণনা বিকৃত হয়েছে যা সম্পূর্ণভাবে বৈদিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। এমনকি ব্রহ্ম গ্রন্থগুলো, মনুস্মৃতি, মহাভারত, রামায়ণ এবং ভগবদগীতা বলে নাই কোনোকিছুই যার কাছাকাছি উপপ্রমেয় হতে পারে এমন অদ্ভূত যে ঈশ্বর তৈরি করেছেন ব্রাহ্মণদের তাঁর মুখ হতে মাংস ছিঁড়ে কিংবা ক্ষত্রিয়দের তাঁর হাতের মাংস থেকে বা অন্যান্যসমূহ। ৫। তাই এটি স্বাভাবিক কেন ব্রাহ্মণরা বেদ অনুসারে সবচেয়ে বেশী সম্মান লাভ করেছে। এমনটিই হচ্ছে আজকের বর্তমান সমাজে। বুদ্ধিজীবিরা এবং অভিজ্ঞরা আমাদের সম্মান অর্জন করেন কারণ তারা তৈরি করেন দিক প্রদর্শনকারী সারা মানবতার জন্য। কিন্তু যেমনভাবে পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, বেদে শ্রমের মর্যাদা সমভাবে জোর দেওয়া হয়েছে এবং এই কারণেই কোনো প্রকার বৈষম্যের উপাদান নেই। ৬। বৈদিক সংস্কৃতিতে সবাইকে ধরা হয় শূদ্র হিসেবে জন্ম। তারপর ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা সে পরিণত হয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যতে। এই শিক্ষা-দীক্ষার পূর্ণতাকে ধরা হয় দ্বিতীয় জন্ম। একারণেই এই তিন বর্ণকে বলা হয় "দ্বিজ" বা দু'জন্মা। কিন্তু যারা রয়ে যায় অশিক্ষিত (যেকোনো কারণেই হোক) তারা সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়। তারা চালিয়ে যায় শূদ্র হিসেবে এবং করে যায় সমাজের সেবামূলক কাজসমূহ। ৭। এক ব্রাহ্মণের পুত্র, যদি সে তার শিক্ষা-দীক্ষা সম্পূর্ণ করতে অসমর্থ হয়, পরিণত হয় শূদ্রে। তেমনিভাবে শূদ্রের পুত্র অথবা এমনকি দস্যু, যদি সে তার শিক্ষা-দীক্ষা সম্পূর্ণ করে, তাহলে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় কিংবা বৈশ্য হতে পারে। এ হচ্ছে নির্ভেজাল যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা। যেমনভাবে এখনকার সময়ে ডিগ্রী প্রদান করা হয়, যজ্ঞপবিত দেয়া হতো বৈদিক নিয়ম অনুসারে। তাছাড়া, আচরণবিধির সাথে অসম্মতি ঘটলে যজ্ঞপবিত নিয়ে নেয়া হতো বর্ণগুলোর। ৮। বৈদিক ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে বর্ণ পরিবর্তনের - (ক) ঋষি ঐতরেয়া ছিলেন দাস বা অপরাধীর পুত্র কিন্তু তিনি পরিণত হন শীর্ষ ব্রাহ্মণদের মধ্যে একজন এবং লেখেন ঐতরেয়া ব্রহ্ম এবং ঐতরেয়াপোনিষদ। ঐতরেয়া ব্রহ্মকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয় ঋগবেদ বোঝার জন্য। (খ) ঋষি ঐলুশ জন্মেছিলেন দাসীর ঘরে যিনি ছিলেন জুয়াখোর এবং নিচু চরিত্রের লোক। কিন্তু এই ঋষি ঋগবেদের উপর গবেষণা করেন এবং কিছু বিষয় আবিষ্কার করেন। তিনি শুধুমাত্র ঋষিদের দ্বারা আমন্ত্রিতই হতেন না এমনকি আচার্য্য হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। (ঐতরেয়া ব্রহ্ম ২.১৯) (গ) সত্যকাম জাবাল ছিলেন এক পতিতার পুত্র যিনি পরে একজন ব্রাহ্মণ হন। (ঘ) প্রীষধ ছিলেন রাজা দক্ষের পুত্র যিনি পরে শূদ্র হন। পরবর্তীতে তিনি তপস্যা দ্বারা মোক্ষলাভ করেন প্রায়ঃশ্চিত্তের পরে। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৪) যদি তপস্যা শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হতো যেমনভাবে উত্তর রামায়ণের নকল গল্প বলে, তাহলে প্রীষধ কিভাবে তা করল? (ঙ) নবগ, রাজা নেদিস্থের পুত্র পরিণত হন বৈশ্যে। তার অনেক পুত্র হয়ে যান ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৩) (চ) ধৃষ্ট ছিলেন নবগের (বৈশ্য) পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং তার পুত্র হন ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.২.২) (ছ) তার পরবর্তী প্রজন্মে কেউ কেউ আবার ব্রাহ্মণ হন। (বিষ্ণু পুরাণ ৯.২.২৩) (জ) ভগবদ অনুসারে অগ্নিবেশ্য ব্রাহ্মণ হন যদিও তিনি জন্ম নেন এক রাজার ঘরে। (ঝ) রাথোটর জন্ম নেন ক্ষত্রিয় পরিবারে এবং পরে ব্রাহ্মণ হন বিষ্ণু পুরাণ ও ভগবদ অনুযায়ী। (ঞ) হরিৎ ব্রাহ্মণ হন ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৩.৫) (ট) শৌনক ব্রাহ্মণ হন যদিও ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্ম হয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৮.১) এমনকি বায়ু পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও হরিবংশ পুরাণ অনুযায়ী শৌনক ঋষির পুত্রেরা সকল বর্ণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। একই ধরনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় গ্রীতসমদ, বিতব্য ও বৃৎসমতির মধ্যে। (ঠ) মাতঙ্গ ছিলেন চন্ডালের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন। (ড) রাবণ জন্মেছিলেন ঋষি পুলৎস্যের ঘরে কিন্তু পরে রাক্ষস হন। (ঢ) প্রবৃদ্ধ ছিলেন রাজা রঘুর পুত্র কিন্তু পরে রাক্ষস হন। (ণ) ত্রিশঙ্কু ছিলেন একজন রাজা যিনি পরে চন্ডাল হন। (ত) বিশ্বামিত্রের পুত্রেরা শূদ্র হন। বিশ্বামিত্র নিজে ছিলেন ক্ষত্রিয় যিনি পরে ব্রাহ্মণ হন। (থ) বিদুর ছিলেন এক চাকরের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং হস্তিনাপুর রাজ্যের মন্ত্রী হন। ৯। "শূদ্র" শব্দটি বেদে দেখা গেছে প্রায় ২০ বারের মতো। কোথাও এটি অবমাননাকরভাবে ব্যবহৃত হয়নি। কোথাও বলা হয়নি শূদ্রেরা হলো অস্পর্শযোগ্য, জন্মগতভাবে এই অবস্থাণে, বেদ শিক্ষা হতে অনুনোমোদিত, অন্যান্য বর্ণের তুলনায় নিম্ন অবস্থাণের, যজ্ঞে অনুনোমোদিত। ১০। বেদে বলা হয়েছে শূদ্র বলতে বোঝায় কঠিন পরিশ্রমী ব্যক্তি। (তপসে শূদ্রম্ - যজুর্বেদ ৩০.৫) একারণেই পুরুষ সুক্ত এদের বলে পুরো মানব সমাজের কাঠামো। ১১। যেহেতু বেদ অনুযায়ী চার বর্ণসমূহ বলতে বোঝায় চার প্রকারের কর্মকান্ড যা পছন্দের উপর ভিত্তি করে, একই ব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে চার বর্ণের বৈশিষ্ট্য চার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে। এইভাবে সকলেই চার বর্ণের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সারল্যতার জন্য, আমরা বলি প্রধান পেশাকে বর্ণের পরিচয় হিসেবে। এবং এই কারণে সকল মানুষের উচিত পূর্ণভাবে চার বর্ণ হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা, যেমনভাবে বেদের জ্ঞান আমাদের বলে। এই হলো পুরুষ সুক্তের সারাংশ। ঋষি বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, অঙ্গীরা, গৌতম, বামদেব ও কন্ব - এরা সকলেই চার বর্ণের বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তারা বৈদিক মন্ত্রের অর্থ উদ্ভাবন করেছেন, দস্যু দমন করেছেন, দৈহিক শ্রমের কর্ম করেছেন এবং নিজেদেরকে যুক্ত করেছেন সমাজ কল্যাণের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায়। আমাদেরও উচিত এমনটিই হওয়া। অবশেষে আমরা দেখলাম বৈদিক সমাজ সকল মানুষকে একই জাতি বা গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে, শ্রমের মর্যাদা বহাল রাখে, এবং সকল মানুষের জন্য সমান সুযোগ প্রদান করে যাতে তারা নিজ নিজ বর্ণ গ্রহণ করতে পারে। বেদে কোনো প্রকার জন্মগত বৈষম্যের উল্লেখ নেই। আমরা যেন সকলে একযুক্ত হয়ে একটি পরিবারের ন্যায় একতাবদ্ধ হতে পারি, প্রত্যাখান করতে পারি জন্মগত সকল বৈষম্যকে এবং একে অপরকে ভাই-বোন হিসেবে সদ্ব্যবহার করতে পারি। আমরা যেন সকল পথভ্রষ্টকারীদের ভুল পথে এগুনো ব্যাহত করতে পারি যারা বেদে বর্ণভেদ সম্পর্কে ভিত্তিহীন দাবী করে এবং দমন করি সকল দস্যু, অসুর, রাক্ষসদের। আমরা যেন সকলে আসতে পারি বেদের আশ্রয়ে এবং একত্রে কাজ করে মানবতার বন্ধনকে আরো দৃঢ় করতে পারি এক পরিবার হিসেবে। সুতরাং বেদ অনুযায়ী কোনো বর্ণভেদ নেই।
সোমবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৭
আর্য আক্রমণ তত্ত্ব: নির্লজ্জ এক মিথ্যাচারের গল্প
ছোটবেলা থেকেই আমরা কল্পকাহিনী শুনতে অভ্যস্ত। এগুলো আমাদের পাঠ্য পুস্তকেও পড়ানো হয়। যেমন আর্যরা ছিল বহিরাগত। তারা ইউরোপ থেকে এসে ভারত দখল করে। বিজয়ী আর্যরা পরাভূত প্রাগার্য গোষ্ঠী ও কৌমের মানুষদের দাস, দস্যু, রাক্ষস বা অসুর বলে উল্লেখ করেছে আর নিজেদের মনে করেছে উন্নততর মানবপ্রজাতির অংশ। এই আর্যদের ধর্মই বৈদিক ধর্ম যা কালক্রমে হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিতি পায়। হিন্দু সমাজের প্রচলিত বর্ণপ্রথায় শুদ্ররাই হচ্ছে এই অনার্যদের বংশধর। গত দেড়শ বছর ধরে এই ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ বা Aryan Invasion Theory হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে হিন্দুবিরোধীরা ব্যবহার করছে। চরম হিন্দুবিদ্বেষী দৈনিক আমার দেশে কয়েক বছর আগে লেখা হয় হিন্দু ধর্ম বর্বর আর্যদের আমদানি করা ধর্ম। দক্ষিণ ভারত আর উত্তর শ্রীলংকার তামিলরা নিজেদের দ্রাবিড় বলে আখ্যা দিয়ে তারা উত্তর ভারতের তথাকথিত আর্য হিন্দুদের ঘৃণা করতে শিখে। হিন্দু পণ্ডিতরা যেমন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী , স্বামী বিবেকানন্দ শুরু থেকেই এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন। আমরা কয়েকটি পর্বে এই আর্য আক্রমণ তত্ত্বের মিথ্যাচার উন্মোচন করব। ১। খ্রিস্টান মিশনারিদের চক্রান্তঃ এই তত্ত্ব সম্প্রসারণের পিছনে লর্ড মেকলে আর জার্মান দার্শনিক মাক্সমুলারের অবদান সবথেকে বেশি। এরা প্রত্যেকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য এই কাজটি করেন। এই মাক্সমুলার প্রথম জীবনে ছিলেন একজন উদ্বাস্তু। তার আত্মজীবনীতেই রয়েছে …Had not a penny left, and that in spite of every effort to make a little money, I should have had to return to Germany.(ref –the life and letters of Maxmuller, vol.1, p.61, London edn) তাই ব্রিটিশদের ধর্মপ্রচারের কাজে তাকে যোগদান করতে হয়। তিনি তার মেধাকে ব্রিটিশদের হাতে বেঁচে দিলেন। I am to hand over to the company, ready for the press, fifty sheets each year-the same I had promised to samter in Germany; for this I have asked 200 pounds a year, 4 pounds a sheet.(ref. the life and letters of Maxmuller, vol.1, p.60-61, London edn.) কর্নেল জোসেফ বোডেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে বোম্বেতে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান উগ্রবাদী। হিন্দুদের খ্রিস্টান বানাতে তিনি মিশনারিদের সহায়তা করতেন। ১৮০৭ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৫০০০ পাউন্ড অনুদান করেন সেখানে সংস্কৃত ভাষার উপর চেয়ার প্রতিষ্ঠা করতে। বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এর নাম করে বোডেন চেয়ার। বোডেনের লক্ষ্য ছিল বাইবেলকে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করে এর মাধ্যমে হিন্দুদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার। এছাড়া মিশনারিরা হিন্দুধর্মকে একটি বহুশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু হিন্দুদের একেশ্বরবাদী চেতনার উৎসই হল বেদ। তাই তাদের লক্ষ্য ছিল বেদকে আক্রমণ করা। এর জন্য মাক্সমুলারের মত ধূর্ত লোকদের দরকার ছিল আরও অনেক বেশী যার ইংরেজি এবং সংস্কৃত ভাষার উপর দখল ছিল অতি জঘন্য। তার কাজ ছিল হিন্দু শাস্ত্রগুলোর অপব্যাখা করা। লর্ড মেকলে যাকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য আমাদের বুদ্ধিজীবীরা পূজা করেন তিনি জন্ম নেন এক ডানপন্থী খ্রিস্টান পরিবারে। ইংরেজি শিক্ষা এবং ইউরোপীয় ভাষা প্রচারের প্রধান লক্ষ্যই ছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচার। ১৮৩৫ এর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। ১৮৩৬ সালের ১২ অক্টোবর তিনি তার পিতাকে চিঠিতে লিখেন, “ our English schools are flourishing wonderfully. We find it difficult – indeed, in some places impossible – to provide instructions for all who want it. At the single town of hoogle fourteen hundred boys are learning English. The effect of this education on the hindoos is prodigious. No hindoo, who has received an English education, ever remains sincerely attached to his religion. Some continue to profess it as a matter of policy; but many profess themselves pure deists, and some embrace Christianity. It is my firm belief that if, our plans of education are followed up, there will not be a single idolater among the respectable classes in Bengal thirty years hence. And this will be affected without any efforts to proselytize; without the smallest interference with religious liberty; merely by the natural operation of knowledge and reflection. I heartily rejoice in the prospects. Ref. the life and letters of Lord Macaulay, pp. 329-330 ” লর্ড মেকলে আর মাক্সমুলারের প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৮৫১ সালে লন্ডনে। পরবর্তী সাক্ষাৎ হয় ১৮৫৫ সালের ডিসেম্বরে। তাদের সেই সাক্ষাৎকারে মাক্সমুলার ভাষাকে ব্যবহারের কথা জানান। তিনি লিখেন। “…I made acquaintance this time in London with Macaulay, and had along conversation with him on the teaching necessary for the young men who are sent out to India. He is very clear headed, and extraordinarily eloquent…I went back to oxford a sadder, and, I hope, a wiser man. Ref. –the life and letters of Maxmuller, vol.1, p.162, London edn” মাক্সমুলার ক্রমাগত সংস্কৃত শাস্ত্রের অপব্যাখা করতে থাকেন। এই বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী তার সত্য প্রকাশ বইয়ের ২৭৮ পৃষ্ঠাতে লেখেন “the impression that the Germans are the best Sanskrit scholars, and that no one has read so much of Sanskrit as Prof Maxmuller, is altogether unfounded exposed Maxmuller. Yes, in a land where lofty trees never grow, even recinus communis or the castor oil plant may be called as oak…. I came to learn from a letter of a principal of some German university, that even men learned enough to interpret a Sanskrit letter are rare in Germany. I have also learnt from the study of Maxmuller’s history of Sanskrit literature and his comments on some mantras of the Veda, that prof. Maxmuller has been able to scribble out something by the help of the so-called tikas or paraphrases of the Vedas current in India” এই মাক্সমুলারই বেদের বিভিন্ন মন্ত্রের অপব্যাখা দিয়ে আর্য আক্রমণ তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। ২। আর্য দ্রাবিড় বিভক্তিঃ ঋগবেদে কোথাও এই কথা নেই যে আর্যরা আক্রমণ করেছে বা বেদের দ্রষ্টা ঋষিরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছেন। তারপরও হিন্দুবিরোধীরা অপপ্রচার চালায় ঋগবেদের বিরুদ্ধে। তারা বলে অঙ্গিরা বংশের ঋষিরা ইন্দ্রের আহ্বান করেছেন দস্যু এবং পানিদের দমন করতে এবং এটাই বুঝায় যে আর্য সেনাবাহিনী স্থানীয় ভূমিপুত্র দ্রাবিড়দের হত্যা করেছে। দ্রাবিড় শব্দের মানে কি? এর সংস্কৃত মূল দ্রব। এর অর্থ তরল জাতীয় বা জলীয়। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তামিলদের সঙ্গম সাহিত্যে দ্রাবিড় বলতে কোন শব্দ নাই। তামিলদের সঙ্গম সাহিত্য ঐ অঞ্চলের জীবন, সময়, ঘটনাপ্রবাহ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত করে। এটা তামিলদের ব্যাকরণেরও বিবর্তন নির্দেশ করে। এর সময়সীমা খ্রিস্টের জন্মের ২০০ বছর আগে থেকে খ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর পরে পর্যন্ত। তাহলে আর্য বলে যদি কোন জাতি বাইরে থেকে এসে দ্রাবিড়দের হত্যা করে তাদের দক্ষিণ ভারতের দিকে অভিবাসী হতে বাধ্য করে তাহলে তামিলদের এই প্রাচীন সাহিত্যে কেন এই ঘটনার উল্লেখ নেই? নবম শতাব্দীর দিকের তামিল সাহিত্যে দ্রাবিড় শব্দটি প্রথম পাওয়া যায়। সেন্থান দিবাকরম নামে একটি শব্দভাণ্ডারে দ্রাবিড় নামটি পাওয়া যায়। এটি ব্যবহৃত হয়েছিল তামিল বুঝাতে। এটি পরিষ্কার যে দ্রাবিড়দের নিয়ে গল্পটি একটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার। উনবিংশ শতাব্দীতে রবার্ট ক্যাডঅয়েল নামক এক খ্রিস্টান ইভানজেলিস্ট প্রথম এই দ্রাবিড় শব্দটি ব্যবহার করেন আর্য আক্রমণ তত্ত্বে। এরপরই এটা রাজনৈতিক রূপ পায়। ৩। ঋগবেদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারঃ দেখা যাক মহাজ্ঞানীরা ঋগবেদের কোন মন্ত্রগুলো ব্যবহার করছে আর্য আক্রমণ তত্ত্ব প্রমাণ করতে। তারা ঋগবেদের ১০/৪৮ সুক্তকে দেখায় যেখানে আছে ইন্দ্র দস্যু, বৃত্র এবং পানিদের দমন করেছেন, তাদের সম্পদ নিয়ে নিয়েছেন এবং বলেছেন যারা তাঁর অনুসারী তাঁরা ব্যর্থ হবে না। বৃত্র এবং পানি দস্যুর প্রকারভেদ। কিন্তু ঋগবেদের ১/৩৩/১-১০ মন্ত্রগুলো পড়লে বুঝতে পারা যায় দস্যুদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ইন্দ্রের সম্পদ আসলে জ্ঞান। ঋগবেদের ১/৩৩/১ মন্ত্রটি শেষ হয় “gavam ketam param avarjate nah” এই কথাগুলো দিয়ে। এর অর্থ দীপ্তিময় গাভীর সর্বোচ্চ জ্ঞান। এই মন্ত্রটির অর্থ হচ্ছে come let us go seeking the cows to Indra, it is he that increases the thought in us, for us, he releases supreme knowledge of the luminous cows. বেদে যারা আধ্যাত্মিক কর্ম করেন তাদের যাজ্যু বলা হয়েছে। এই উৎসর্গ যেই সত্ত্বাদের উদ্দেশে করা হত তাদের যাজত বলা হত। যাজ্যুকে তার শুভবুদ্ধির জন্য সুক্রাতু বলা হত। সুক্রাতু যখন ঐশ্বরিক বানী লাভ করতেন তাদের বলা হত বিশ্বের গায়ক। দস্যু শব্দটি সুক্রাতু এবং যাজ্যুর ঠিক বিপরীত। একে বলা হত অযাজ্যু। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দস্যু বিশ্বের গায়কদের ঘৃণা করে। এই জন্য একজন দস্যুকে বলা হত ব্রহ্মদ্ভিসা এবং অনাসা ( যার কথা বলার কোন মুখ নেই ) ও অমানযামানা ( যার কোন মানসিক বিবেকবোধ নাই )। বেদে বলা আছে দস্যুদের যে জ্ঞান তা ইন্দ্র কেড়ে নেন মানুষের সাহায্যে। ঋগবেদের আরেক জায়গাতে আছে পানি এমন এক ধরণের দস্যু যারা পবিত্র গাভি চুরি করে তাদের গুহাতে আটকে রাখে। ইন্দ্র মানুষের সহায়তায় তা উদ্ধার করেন। ঋগবেদের ৬/৫১/১৪ তে ইন্দ্রের প্রতি প্রার্থনা করা হয়েছে পানিদের ধ্বংস করতে এবং পানিদের নেকড়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ঋগবেদের ৩/৩৪/৭-১০: ৭। ইন্দ্র,সাহসীদের প্রভু,যিনি সকলের শাসনকর্তা,যিনি সকল শক্তির মুল,যার শৌর্যে শক্তিশালী শৌর্যময়, এই পৃথিবীতে তার এই দান এর জন্য জ্ঞানীগন তার প্রশংসা করেন। ৮। অনন্যসাধারন,সর্বজয়ী,সকল জয়ের দাতা,আলোক এবং পানির উত্স ,স্বর্গ ও মর্তের মালিক,সেই ইন্দ্রকেই সকলে ভক্তিসহকারে বন্দনা করে। ৯। তিনি শক্তিশালী সূর্য ও অশ্ব এর মালিক(সংস্কৃত তে শক্তি এর প্রতীক হিসেবে সূর্য,অশ্ব এবং বৃষ এই তিনটি শব্দ প্রায়শই ব্যবহৃত হয়ে থাকে)।তিনি আমাদের গোসমূহ যোগান দিয়ছেন যা আমাদের দুগ্ধের যোগান দেয়।তিনিই স্বর্নময় সকল গুপ্তধনের উত্স(,তিনি দস্যুদের ধ্বংস করেন এবং আর্যদের রক্ষা করেন। ১০। তার শক্তিতেই গাছপালা বেড়ে উঠে,দিনের পর দিন আবর্তিত হয়;তিনি এই ভুখন্ড এবং বায়ুমন্ডল এর অধিকারী,তিনি অসতদের বিনাশ করেন,দাম্ভিকদের নিবৃত্ত করেন।তিনিই গাছপালা, বনজঙ্গল, আকাশ, দিনরাত্রির শৃঙ্খল রক্ষা করেন। এখন দস্যুরা যদি মনুষ্য সন্তান হয় এবং তারা অনার্য আদিবাসী হয় তবে তাদের থেকে ইন্দ্র কি করে আকাশ এবং দিনকে মুক্ত করেন? বেদে আরও আছে ইন্দ্র দস্যুদের তাড়া করেন এবং তাদের বিতাড়িত করেন স্বর্গ এবং মর্ত্য থেকে তার বজ্রের সাহায্যে। ইন্দ্রের মহত্ত্ব বাড়তে থাকে এবং ইন্দ্রের দীপ্তি দস্যুদের পলায়নের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এরপর ইন্দ্র হারিয়ে যাওয়া সূর্যকে উদ্ধার করেন এবং সেই সূর্য যখন উদিত হয় তখন তার আলোয় গুহাগুলো আলোকিত হয় যেখানে ভালা (এক ধরণের দস্যু) পবিত্র গাভীগুলি লুকিয়ে রেখেছে। তাহলে আমরা এমন এক চিত্র পাই যেটা সম্পূর্ণভাবে আর্য আক্রমণ তত্ত্বের বিরুদ্ধে যায়। পরবর্তী লেখায় বেদে দস্যু তাদের বলা হয়েছে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। ৪। সঙ্গম সাহিত্য থেকে প্রমাণঃ আমরা এখন তামিলদের সাহিত্যের দিকে নজর দেই। আমরা দেখি আসলেই কি তামিলরা তথাকথিত দ্রাবিড় যারা আর্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিল। সঙ্গম সাহিত্যে পৃথিবীকে ভাগ করা হয়েছে মুল্লাই (বন), কুরিঞ্ছি (পাহাড়), মারুদাম (কৃষি ভূমি), নেইদাল (সমুদ্র সৈকত) এবং পালাই (খোলা ভূমি) এই পাঁচ ভাগে। তল্কাপ্পাইয়াম সাহিত্যে আছে এই জায়গাগুলোর দেবতা হচ্ছে মুল্লাইঃ তিরুমাল/ বিষ্ণু। কুরিঞ্ছিঃ সেয়ন ( কুমার/মুরুগুয়া/ কার্ত্তিকেয়)। মারুদামঃ ভেন্দান/ইন্দ্র। নেইদালঃ বারুনান/ বরুণ। পালাইঃ কররাভাই/ শক্তি। সঙ্গম সাহিত্যের আরেকটি অংশ হচ্ছে পুরানানুরু। সেখানে আছে শিব তিনটি শহরকে ধ্বংস করেছেন (ত্রিপুরা সামহারা)। সেখানে আছে শিব এক হাতে মেরু পর্বত তুলে নেন তীরধনুক হিসেবে। একটা ভয়ংকর সরীসৃপকে তীর ধনুকের ছিলা হিসেবে ব্যবহার করেন। একটা তীরের আঘাতে শহর তিনটিতে আগুন লেগে যায় এবং তা ধ্বংস হয়ে যায়। পুরানানুরু সাহিত্যে কার্তিককে বারবার দেখা যায় শিবের ছেলে হিসেবে। এটা আমাদের অগ্নিকুমার যিনি পুরাণের কার্তিকেয়র প্রতিচ্ছবি তার সাথে শিবের সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করে। আর্য আক্রমণ তত্ত্বের সমর্থকদের দেখা যায় শিবকে শুধু দ্রাবিড়দের দেবতা বলতে দেখা যায়। সত্য এই যে বেদের রুদ্র থেকে পৌরাণিক শিবের উৎপত্তি। তৈত্তিরীয় সংহিতা বা কৃষ্ণ যজুর্বেদ এর রুদ্রম ভাগের বিভিন্ন ভাগে রুদ্র সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধরনের বেশকিছু বৈশিষ্ঠ্য উল্লেখিত হয়েছে।আর শিব হল সেই বেশ কিছু গুলের একটি নির্দিষ্ট অংশের প্রতীক।পরবর্তীতে রুদ্রের বদলে অধিকাংশ স্থানেই শিব শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।তামিল গ্রন্থসমুহ যেমন পেরিয়া বা পুরানাম সমুহে শিবের যে বৈশিষ্ঠ্য দেখানো হয়েছে তা বেদের রুদ্রের সমরুপ।চিদাম্বরাম,থেবারাম এলাকাগুলোতে এখনও রুদ্রাম/চমকম পাঠ করা হয়।যদি তামিলদের শিব আর বৈদিক শিব আলাদা হত তবে তা নিশ্চয় করা হতনা।আসলে তৈত্তিরীয় সংহিতার রুদ্রাম সংস্কৃতিটাই এখনো তামিলনাড়ু, কর্ণাটকে বিদ্যমান। ৫। কেন এই আর্য আক্রমণ তত্ত্বঃ ইন্দোইউরোপিয়ান ভাষাগুলোর পারস্পরিক মিল দেখে ধারণা করা হয় যে এই ভাষাভাষীরা সকলে একই পূর্বআবাসস্থল থেকে এসেছে। সংস্কৃতের সাথে ইউরোপিয়ান বেশ কয়েকটি ভাষার মিল দেখে কেবল ভাষাগত মিল দেখেই জার্মান ইন্ডোলোজিস্ট ম্যাক্স মুলারই প্রথম আর্য আক্রমণ তত্ত্বের সূচণা করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আর্যরা রাশিয়ার দক্ষিণ অংশ থেকে মাইগ্রেট করে ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম অধিবাসীদের আবাস তথা সিন্ধু উপত্যকায় পৌছে। ম্যাক্স মুলারের এই তত্ত্বে কেবল ভাষাগত মিলকে বিবেচনায় নিয়েই এরকম একটি তত্ত্বকে দাঁড় করানো হয়। সিন্ধু সভ্যতার কোন আর্কিওলজিকাল এভিডেন্স তখনও আবিস্কৃত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের দিকে যখন হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ও লোথাল নগর সভ্যতা আবিস্কৃত হয় তখন তত্ত্বটির খানিকটা পরিবর্তন হয়। যাযাবর বর্বর আর্যরা ইউরোপ থেকে এসে উন্নত নগর সভ্যতায় আক্রমণ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে সভ্যতাগুলোকে ধ্বংস করে। মহেঞ্জোদারো খনন করতে গিয়ে মন্টিমার হুইলার একেবারে উপরের অংশে কিছু মানুষের খুলি-হাড়গোড় পেলে এ তত্ত্বটি আরো দৃঢ় হয় এবং মোটামুটি সর্বজনবিদিত তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়। তত্ত্বটি অনুযায়ী খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে আর্যরা ভারতের প্রাচীন কিন্তু সভ্য অধিবাসী দ্রাবিড়দের আক্রমণ করে। এই অসভ্য-বর্বর-যাযাবর-পশুপালক জাতিই আর্য জাতি। এদের হাতেই ঋগ্বেদ রচিত হয়। কী সহজ ইতিহাস! এবারে দেখি তাদের এ ধরণের ইতিহাস লেখার কারণগুলো কী কী। ম্যাক্স মুলার বা অন্য যারা এই তত্ত্বের প্রবক্তা ও প্রচারক তারা সবাইই মনে করতেন বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব নির্ভুল। সুতরাং পৃথীবীর বয়স কোনক্রমেই খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের বেশী যেতে পারে না। সুতরাং খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ এর বেশি তারা মোটেই ভাবতে পারেনি কারণ বাইবেল অনুযায়ী নুহের প্লাবন হয়েছে খ্রীষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে। কেউ কেউ অবশ্য আরো নিচে নেমে এসেছেন। কারো কারো মতে খ্রীষ্টপূর্ব ১১০০-৯০০ সালও হতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জার্মান আর্যশ্রেষ্ঠ তত্ত্ব। যেহেতু ঋগ্বেদের রচয়িতারা নিজেদেরকে আর্য বলেছেন সুতরাং ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল। এবার আসি এই ইতিহাসের পূনর্মূল্যায়নে। ঋগ্বেদে আর্য শব্দটি কি একটি জাতিকে বুঝিয়েছে? ঋগ্বেদে আর্য শব্দটি গৌরব বা মর্যাদার অর্থ বহন করেছে, মোটেই কোন জাতিকে বুঝায়নি। ইরানী আবেস্তায়ও আর্য শব্দটি গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ববোধের পরিচায়ক। আর্য ও দ্রাবিড় যদি দুটো ভিন্ন জাতি হত তাহলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের অধিবাসীদের একই দেবতা, একই ঈশ্বর, প্রায় একই ভাষা (সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত), একই পৌরাণিক বিশ্বাস ও গল্প হতে পারত না। দ্রাবিড়িয়ান কি কোন আলাদা জাতিগোষ্ঠী? তা তো নয়। তাহলে দাড়ায়- ককেশিয়ানরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে একদল আর্য আরেকদল দ্রাবিড়িয়ান হয়েছে। দুই মহাদেশের বিশাল অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের ভাষা একই পরিবারভুক্ত হওয়ায় এবং একইসাথে আবেস্তা ও ঋগ্বেদের মিল দেখে পণ্ডিতগণ অনুমান করেছিলেন যে এরা একই আদি জনগোষ্ঠী থেকে ছড়িয়ে পড়ে সভ্যতা গড়ে। তাদের অনুমান ঠিকই ছিল কিন্তু যখন তারাই এই আর্যদের যাযাবর পশুপালক বর্বর বলেন আবার ঋগ্বেদও তাদের দ্বারা রচিত বলেন তখন তাদের ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ না হয়ে উতড়ে যেতে পারে না। ঋগ্বেদ যদি তথাকথিত আর্যদের দ্বারা রচিত হয় তাহলে কেন ঋগ্বেদে কোথাও ইউরোপীয় স্থান, নদী ইত্যাদির নামও নেই? তারা যখন বলেন আর্যরা খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে সিন্ধু সভ্যতা আক্রমণ করে আর এদিকে আমরা ঋগ্বেদে খরস্রোতা স্বরস্বতী নদী দেখতে পাই, যে নদী খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে মরে যায় (সম্ভবত প্লেট টেকটোনিক মুভমেন্টের জন্য) তখন এ ইতিহাস যে মিথ্যা তা আর দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না। তাছাড়া পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের মেহরগড় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি খননের পর দেখা যায় প্রায় ৯৫০০ বছর আগে নবপ্রস্তর যুগে এখানকার অধিবাসীরা যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থিতিশীল গ্রামীণ কৃষি জীবনে চলে গিয়েছিল। খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ সাল পর্যন্ত সেখানে কোন বাইরের জনগোষ্ঠীর আগমণ ঘটেনি। ঋগ্বেদ যে কোন যাযাবর জনগোষ্ঠীর রচিত হতে পারে না তা ফুটে ওঠে এর সমাজচিত্র রূপায়নে, গৃহনির্মাণের উপমা প্রয়োগে, অট্টালিকা, তন্তুবায়, ভেষজ চিকিৎসা ইত্যাদি শব্দপ্রয়োগে। চান্দ্রমাসে হিসাব করলে যে প্রতি তিন বছর একটি ১৩ মাসে বছর হতে হয় (যা কৃষিকাজ ইত্যাদির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়), যাকে বৈদিক সমাজ মলমাস বলত (এখনো হিন্দুরা বলে) তাও বেদে উল্লেখ পা্ওয়া যায়। এরকম কয়েকশ উদাহরণ দেয়া যাবে যাতে প্রমাণিত হয় যে বেদের রচয়িতা মোটেই তথাকথিত আর্যরা হতে পারে না। প্রত্মতাত্ত্বিকভাবে এখন জানা যাচ্ছে যে মেহেরগড়ে মৃৎশিল্প-পূর্ব যুগে এখানকার মানুষ স্থিতিশীল বসতি গড়ে এবং পশুপালন ও কৃষিকাজ শুরু করে। পরবর্তীতে কালক্রমে তারা বৃহত্তর সিন্ধু-সরস্বতী উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাম্রযুগ ও আদি হরপ্পান পর্যায় পেরিয়ে তারা প্রায় ২৬০০ খ্রীস্টপূবাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এক স্থায়ী নগর সভ্যতা গড়ে তোলে যাকে হরপ্পান সভ্যতাও বলা হয়। সকলকে জানিয় দিন। নমস্কার। লেখক- রজত দাশ গুপ্ত


হিন্দু ধর্মে বৈদিক বিবাহ রীতির ধাপসমূহের সংকলন ধাপসমূহঃ
1পাটিপত্রঃপাটিপত্র বাঙালি হিন্দু বিবাহের প্রথম আচার। এই আচার লগ্নপত্র বা মঙ্গলাচরণ নামেও পরিচিত। ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে নগদ বা গহনাপত্রে যৌতুক ও অন্যান্য দেনাপাওনা চূড়ান্তভাবে স্থির করার জন্য যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই পাটিপত্র বলে। এই আচারের মাধ্যমেই বিবাহের অন্যান্য আচারের সূচনা ঘটে। 2পানখিলঃপানখিল বাঙালি হিন্দু বিবাহের দ্বিতীয় আচার। এটি পাটিপত্রের ঠিক পরেই পালিত হয়। পানখিলের অর্থ পান পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খিল দেওয়া বা খড়কে বেঁধানো। এই আচারটি প্রথমে বরের বাড়িতে এবং পরে কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পানখিল আচারে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিনীরা ‘বিয়ের গান’ গেয়ে থাকেন। এই গানের বিষয়বস্তু হল রাম ও সীতার বিবাহ। 3দধি মঙ্গল: বিবাহের দিন বর ও কন্যার উপবাস। তবে উপবাস নির্জলা নয়। জল মিষ্টি খাওয়ার বিধান আছে। তাই সারাদিনের জন্য সূর্য্যোদয়ের আগে বর ও কন্যাকে চিড়ে ও দৈ খাওয়ানো হয়। 4গায়ে হলুদ: সংস্কৃত ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় গাত্রহরিদ্রা। হিন্দু ধর্মে কয়েকটি জিনিসকে শুভ বলা হয়। যেমন শঙ্খধ্বনি, হলুদ ইত্যাদি। প্রথমে বরকে ও নিতবরকে সারা গায়ে হলুদ মাখানো হয়। পরে সেই হলুদ কন্যার বাড়ী পাঠানো হয়। কন্যাকে সেই হলুদ মাখানো হয়। 5শঙ্খ কঙ্কন: কন্যাকে শাখা পরানো হয়। এরপর বিকালে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় 6বর বরণ: বর বিবাহ করতে এলে তাকে স্বাগত জানান কন্যাপক্ষ। সাধাবনত: কন্যার মা তার জামাতাকে একটি থালায় প্রদীপ, ধান দুর্ব্ব ও অন্যান্য কিছু বরণ সামগ্রী নিয়ে বরণ করেন। এরপর বরকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় ও দুধ এবং মিষ্টি খাওয়ানো হয় । 7সাত পাক: বিবাহের মন্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিঁড়িতে বসিয়ে আনা হয়। সাধারণত: কন্যার জামাইবাবুরা পিঁড়ি ধরে থাকেন। কন্যা পান পাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন। কন্যাকে পিঁড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়। 8শুভদৃষ্টি: বিবাহের মন্ডপে জনসমক্ষে বর ও কন্যা একে অপরের দিকে চেয়ে দেখন। 9মালা বদল: কন্যা ও বর মালাবদল করেন। এই রীতির অর্থ হচ্ছে দুজন একে অন্যকে জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিলেন। মুসলমান মতে একই ভাবে কন্যাকে বলতে হয় "কবুল"। আবার ঠিক এই রকমই খৃষ্টান মতে চার্চের ফাদারের সামনে বর ও কন্যা বিবাহে সন্মতি জানান। 10সম্প্রদান: কন্যার পিতা কন্যাকে জামাতার হাতে সম্প্রদান করেন বেদমন্ত্রে। বরও জানান যে তিনি কন্যার ভরন পোষনের দ্বায়িত্ব নিলেন। বিবাহের মন্ত্র হল যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম। 11অঞ্জলি: কন্যা ও বর খৈ অগ্নাহুতি দেন। প্রচলিত বাংলায় একে বলে খৈ পোড়া। বৈদিক যুগে মানুষ নানা ধরনের শক্তির উপাসনা করতেন। অগ্নিও তাদের মধ্যে অন্যতম। 12সিঁদুর দান: বিবাহের শেষ রীতি হল বর কন্যার কপালে সিঁদুর লেপন করেন। বাঙালি হিন্দু নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরেন। জাতিভেদে ও অঞ্চলভেদে এই রীতি কিছু পরিবর্তিত হয়। তবে জানাবেন। ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। নমস্কার সবাইকে।


জাতিভেদ প্রথা(Caste System)
আসুন আগে দেখে নেই গীতায় এ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে ? ১৮/৪১ “হে পরন্তপ ,স্বভাবজাত গুণের জন্যই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শূদ্র,এই চার জাতির কর্ম সমূহ বিভক্ত হয়েছে ।” ব্রাহ্মণের কি কাজ বা করনীয় ? ...১৮/৪২ ‘শম, দম ,তপস্যা,ক্ষমা,ক্ষান্তি,সরলতা জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য – এই ,কয়েকটি, ব্রাহ্মণদের স্বভাবজাত কর্ম ।’ অর্থাৎ এগুলো না থাকলে কাউকে ব্রাহ্মণ বলা যাবে না । ক্ষত্রিয়ের কী করণীয় ?......১৮/৪৩ “শৌর্য,তেজ, ধৃতি,দক্ষতা,অপরাদন্মুখতা, দানশীলতা ও শাসন ক্ষমতা – এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম ।” শূদ্রের কী করণীয়?....১৮/৪৪ “কৃষি,গোরক্ষা,ওবাণিজ্য – এই কয়েকটি বৈশ্যের স্বাভাবিক কর্ম । পরিচর্যা শূদ্রের স্বভাবজাত কর্ম । জন্ম সূত্রে কেউ ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হতে পারে না । ভগবানের সেবাই তার পরিচয় ।


নমস্কার ও প্রনাম সম্পর্কে ৫ টি তথ্য
1 নমস্কার ছোট-বড় সকলকে জানানো যায়। যেমন একজন বয়স্ক মানুষ তার নাতী/ নাতনীকে এভাবে সম্বোধন করতে পারেন,''নমস্কার দাদু--কেমন আছ?'' নমস্কার জানাতে কোন লজ্জা নেই। বরং সম্মানের বিষয়। 2 বয়সে বড়দের প্রনাম করুন। কিন্তু ছোট কাউকে প্রনাম করতে নেই। এমনকি কাকা, মাসি, পিসি ছোট হলে ও নয়। 3 বিগ্রহকে কখনো একহাতে প্রনাম করতে নেই, সর্বদা দুইহাতে বুকে ও মাথায় হাত ঠেকিয়ে করতে হবে। 4 মন্দিরের ভিতরে/ বিগ্রহের সামনে কখনো কাউকে প্রনাম করতে নেই। 5 ঘুমন্ত বা শায়িত ব্যক্তি কে প্রনাম করা উচিত না। আপনাদের মূল্যব্যান মতামত আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে অনুপ্রেরণা। ভালো লাগলে বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করতে পারেন। নমস্কার সবাইকে।
মোহাম্মদ মজিদ এখন ধর্ম দাস হলেন।
মুসলিম পরিবারে জন্মে ছিলেন মোহাম্মদ মজিদ। শান্তির খোঁজ করেও কখনো শান্তির দেখা পায়নি মোহাম্মদ মজিদ।।তিনি এক চিলতে শান্তির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন,ভেবে দেখেছেন বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে। অবশেষে খুঁজে পেলেন শান্তির ধর্ম, গ্রহন করলেন "হিন্দু ধর্ম"। মোহাম্মদ মজিদ এখন ধর্ম দাস হলেন।এটা আমার কথা নয় ধর্ম দাসের কথা।বাস্তরিত জানতে নিচের লিংঙ্কে ক্লিক করুন। http://www.hinduhumanrights.info/majid-khan-to-dharam-dass-returning-back-to-my-ancestral-roots/ 

মুক্তিযুদ্ধে ২২ লাখের বেশি হিন্দু শহীদ হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এক লাখ হিন্দু নিধন আমেরিকায় সদ্য প্রকাশিত একটি বই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড়সড় আলোচনার ঝড় তুলেছে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যলয়ের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক গ্যারি জে বাস তার সম্প্রতি প্রকাশিত “ দি ব্ল্যাড টেলিগ্রাম : নিক্সন কিসিঞ্জার অ্যান্ড এ ফরগটন জেনোসাইড ” বইতে লিখেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রায় এক লাখ হিন্দুকে নির্বিচারে খুন করেছিল। তৎকলীন পূর্ব পাকিস্তানে আক্ষরিক অর্থে চালানো হয়েছিল গণহত্যা। অসহায় ভাবে তখন খুন হয় বিপুল সংখ্যক হিন্দু। নিজেদের স্বার্থের জন্য তখন ভারত ও মার্কিন সরকার চোখ বন্ধ করেছিল বলেও ঐ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলদেশে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কাজ চলছে তখনই গ্যারি জে বাসের এই বই তুমুল আলোচনা- সমালোচনা র সাইক্লোন বইয়ে দিচ্ছে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে। আমেরিকায় এ সপ্তাহের শুরুতে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে ৪০ বছর আগের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তাকে ঘিরে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। খবর বর্তমান , পিটিআই ও ওয়াশিংটনের। জে বাস তার বইতে লিখেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আক্ষরিক অর্থেই গণহত্যা চালিয়েছিল। আর সর্বত্রই টার্গেট করা হয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত বাঙালীদের । যুদ্ধের শুরুতেই অসহায় অবস্থায় খুন হয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ হিন্দু । অথচ আশ্চার্যজনকভাবে বিষয়টিকে ছোট করে দেখিয়েছিল সেই সময়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকা ইন্দ্রিরা গান্ধির কংগ্রেস সরকার। শুধু তাই নয়, অদ্ভুতভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এই নিরবতা কেন ? এমন প্রশ্ন তুলেছেন জে বাস তার বইতে। শুধু মার্কিন প্রশাসন নয়, তখনকার ভারত সরকারের তীব্র সমলোচনা করেছেন লেখক জে বাস। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে যখন প্রত্যেকদিন নিয়ম করে হিন্দু নিধন চলছিল তখন ভারত সরকার বিষয়টির আসল গুরুত্ব প্রকাশে রাজি ছিলনা। কারণ, ইন্দিরা গান্ধি সরকার চায়নি তখনকার বিরোধী দল জনসংঘ তথা আজকের বিজেপি এই নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পাক। পাক সেনারা যখন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে তখন ভারতের সংসদ সদস্যরা গোলাবারুদ দিয়ে হিন্দুদের সাহায্য করেনি। কারণ সেই একটাই, যদি গোলাবারুদ দেওয়া হয় , তাহলে গোটা গণহত্যার বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসবে। আর তা নিয়ে রাজনীতি করবে জনসংঘ বা বিজেপি। বইয়ে তিনি আরো লিখেছেন, তখন পাকিস্তানী জেনরেল ইয়াহিয়ার হিন্দু নিধনের পক্ষে যুক্তি ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ বাঙালি হিন্দু। এরা ইসলাম বিরোধী। এরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় তারা পরাজিত হয়েছেন। “ভবিষ্যতে শাসন কায়েম রাখতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে থাকা হিন্দু বাঙালিদের স্রেফ ছেঁটে ফেলা দরকার” বলে মন্তব্য করেন ইয়াহিয়া। বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযনে নেতৃত্ব দেওয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের যুক্তি ছিল যে, “পূর্ব পাকিস্তান ভারতের দাসত্ব করছে। বহু ত্যাগের পর যে স্বাধীনতা এসেছে তাকে এবং দেশটাকেই আওয়ামীলীগ ধ্বংস করে দেবে।” তখন পাক সেনারা একে অপরের সঙ্গে মজা করে বলত,“আজ কত হিন্দু মেরেছ ?” জে বাস লিখেছেন, সশস্ত্র পাক সেনাদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় এক কোটি নিরস্ত্র হিন্দুর অসম লড়াই হয়েছিল। ভারতের সহযোগিতার কলঙ্ক এবং নয়াদিল্লির উদ্দেশ্য সাধনের অভিযোগের তকমা লাগানো হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের গায়ে। যে কারণে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হিন্দুদের ওপর চালিয়েছিল মর্মান্তিক গণহত্যা। বাংলাদেশের হিন্দু সংগঠনগুলোর হিসেব মতে, মুক্তিযুদ্ধে ২২ লাখের বেশি হিন্দু শহীদ হয়েছেন। এছাড়া ওই সময় প্রায় ১ কোটি বাঙালি আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। দি ব্ল্যাড টেলিগ্রাম : নিক্সন কিসিঞ্জার অ্যান্ড এ ফরগটন জেনোসাইড বইতে গ্যারি জে বাস আরো লিখেছেন, ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্চার ব¬াড ভেবেছিলেন, হিন্দুদের নিধন বা তাড়নো নিয়ে বেশি হইচই করার প্রয়োজন নেই। বইতে সে সময় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যও স্পষ্ট উলে¬খ করা হয়েছে। তিনি এক বৈঠকে রিচার্ড নিক্সনকে স্বয়ং জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাচ্ছে। আতঙ্কে প্রতিদিন প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এক সময় কিসিঞ্জার নাকি বলেছিলেন, ইয়াহিয়া খান আবার একটা মূর্খের মতো ভুল করলো হিন্দুদের তাড়িয়ে। যদিও সেই বৈঠকে রাষ্ট্রদূতের কথার কোন উত্তর দেননি কিসিঞ্জার। জবাব মেলেনি নিক্সনের পক্ষ থেকেও। ভারত এবং আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থ এবং নিরবতার কারণেই বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র হিন্দুদের নির্বিচারে খুন করতে উৎসাহ পেয়েছিল বলে মনে করেন জে বাস। ৪০ বছর পর এই তথ্য ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করলো। 

এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)